Hesperian Health Guides

মশা থেকে সৃষ্ট ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, এবং অন্যান্য অসুস্থ্যতা

হেসপেরিয়ান স্বাস্থ্যউইকি > নতুন যেখানে ডাক্তার নেই > মশা থেকে সৃষ্ট ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, এবং অন্যান্য অসুস্থ্যতা

দু'টি শিশুসহ একজন নারীর চারপাশে মশা

মশা অনেক অসুস্থ্যতা বহন করে এবং সেগুলো তাদের কামড়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। জলবায়ুর পরিবর্তন আবহাওয়া উষ্ণ ও আদ্রতর করে তুলছে, যে অবস্থাগুলো মশা বিস্তারের জন্য অনুকূল। অনেক ভিন্ন ধরনের মশা আছে—কোন কোন মশা ডোবার জলে বংশবিস্তার করে, অন্যান্যগুলো বৃষ্টিতে বা সংরক্ষিত পানীয় জলে। কোন কোন মশা রাতে কামড়ায় অন্যগুলো দিনের বেলায়। কোন কোনটি শুধুমাত্র মানুষের মধ্যে অসুস্থ্যতা ছড়ায়, এবং অন্যগুলো প্রণীদেরকেও অসুস্থ্য করে তুলতে পারে।

কামড় দেবার মাধ্যমে মশা অসুস্থ্যতা ছড়ায়

মশা থেকে ভাইরাস। মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ানো অনেক অসুস্থ্যতাই ভাইরাসের কারণে সৃষ্টি হয়। বেশীরভাগ ভাইরাসের ক্ষেত্রে ব্যক্তিটি একবার ভাল হয়ে উঠলে সে রোগ প্রতিরোধক হয়ে উঠবে এবং একই ভাইরাস আর তাকে আক্রান্ত করবে না। কিন্তু কোন কোন ভাইরাস যেমন ডেঙ্গুর সামান্য আলাদা বৈশিষ্টপূর্ণ বেশ কয়েকটি সংস্করণ আছে (সেরোটাইপ বলা হয়), ফলে একজন ব্যক্তি একাধিক বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে অসুস্থ্যতাটি আরও বেশী সঙ্কটজনক হয়ে উঠতে পারে।

একটি এলাকার অনেক ব্যক্তিই একবার ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে তারা প্রত্যেকেই প্রতিরোধক হয়ে উঠবে। তখন অল্প সংখ্যক ব্যক্তি অসুস্থ্য হবে এবং মনে হতে পারে যে অসুস্থ্যতাটি চলে গেছে। কিন্তু এলাকাতে শিশুর জন্ম হলে এবং যাদের কখনওই এই অসুস্থ্যতাটি হয়নি এলাকায় তাদের আগমণ হলে ভাইরাসটি আবারও ক্ষতি করতে পারে। তাই হয়তো কোন কোন বছরে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে আবার কোন কোন বছর খুব কম রোগ দেখা দেবে। এই একই কারণে যে অঞ্চলের কারোরই সংক্রামণ হয়নি এমন একটি অঞ্চলে একটি নতুন ভাইরাস আসলে অনেক ব্যক্তিই সাথে সাথে অসুস্থ্য হয়।

মশা থেকে পরজীবি। একটি খুবই ছোট পরজীবি থেকে ম্যালেরিয়া হয় যা আমাদের রক্ত কোষের মধ্যে প্রবেশ করে এবং তার মধ্যে বেঁচে থাকে। এই পরজীবি আমাদের রক্তের মধ্যে একটি আক্রান্ত মশার কামড়ের মাধ্যমে প্রবেশ করে। মশা ম্যালেরিয়ার এই পরজীবি একজন লোকের শরীরের মধ্যে প্রবেশ করানোর পর অনেক বছর ধরে এগুলো মাঝে মধ্যেই অসুস্থ্যতার সৃষ্টি করবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যক্তিটি পরজীবিগুলোকে মেরে ফেলার জন্য ঔষধ গ্রহণ করে। ম্যালেরিয়া যেখানে সচরাচর দেখা যায় এমন জায়গায় অনেক বছর বাস করার পর একজন ব্যক্তি হয়তো আর তেমন অসুস্থ্য হবে না কারণ তার দেহ এই পরজীবির বিরুদ্ধে লড়াই করার সমর্থ্য অর্জন করেছে। গর্ভবতী নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষা দরকার কারণ তারা খুব সহজেই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে এবং তা জ্বর, রক্তসল্পতা, এবং জলশূন্যতার সৃষ্টি করে তাদের জন্য আরও বেশী ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে।

একজন নারী কথা বলছে
মশা ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়ার মতো সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্তু মশা এইচআইভি ছড়াতে পারে না!

রোগ কিভাবে ছড়ায়। মশা থেকে সৃষ্ট অসুস্থ্যতা সরাসরি একত্রে বসবাসকারী ব্যক্তি বা পরস্পর স্পর্শ করা ব্যক্তিদের মধ্যে ছড়ায় না। কিন্তু মশা যে ব্যক্তির শরীরে পরজীবি বা ভাইরাস আছে তাকে কামড়ানোর মাধ্যমে সেই পরজীবি বা ভাইরাস পেতে পারে এবং তারপর অন্য আর একজন ব্যক্তিকে কামড়ানোর মাধ্যমে তা সেই ব্যক্তির মধ্যে বাহিত করতে পারে, তাই পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা প্রায়শই একজনের পর আর একজন পরপর অসুস্থ্য হয়। কিভাবে মশা রোগ ছড়ায় তা বোঝার মাধ্যমে মশাবাহিত অসুস্থ্যতা থেকে নিজেদেরকে সুরক্ষা করার বিষয়টি বুঝতে এলাকাবাসীর সাহায্য হবে।

যদিও জিকা ভাইরাস মূলত মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়, এটি যৌনক্রিয়ার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। জিকা সাধারণতঃ একটি মৃদ্যু অসুস্থ্যতা, কিন্তু যদি একজন গর্ভবতী নারী জিকা আক্রান্ত হয়, তবে তা তার গর্ভের শিশুর প্রচুর ক্ষতি করতে পারে। মশার কামড় রোধ করে ও কনডম ব্যবহার করার মাধ্যমে নারীকে জিকা থেকে রক্ষা করুন।

মশা দ্বারা ছড়ানো সাধারণ অসুস্থ্যতাগুলোর লক্ষণ

NWTND mosq Page 2-2.png

মশা দ্বারা ছড়ানো অসুস্থ্যতাগুলোর মধ্যে আছে, ম্যালেরিয়া, পীত জ্বর, ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া, ওয়েষ্ট নাইল ভাইরাস, এবং জাপানী এনসেফালাইটিস। প্রতিটিরই মৃদু এবং তীব্র ধরন রয়েছে। এই রোগগুলো প্রয়শই জ্বর, ফুসকুড়ি, এবং ব্যথার সৃষ্টি করে। একই সময়ে একাধিক ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যাওয়া সম্ভব। লক্ষণগুলো রোগ সনাক্ত করতে সাহায্য করে, কিন্তু বেশীরভাগ সময়েই এগুলো নির্দিষ্ট করা কঠিন। আপনার এলাকায় কোন কোন মশাবাহিত অসুস্থ্যতা রয়েছে সে সম্পর্কে সাধারণতঃ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ওয়াকিবহাল থাকে।

কোন মশাবহিত অসুস্থ্যতা এটি?

জ্বর আছে কি?
প্রথমে জ্বর, পরে শীত শীত লাগা, তারপর আবার জ্বর। এটি ম্যালেরিয়ায় সাধারণতঃ দেখা যায়। ডেঙ্গু এবং পীত জ্বরে হয়তো জ্বর ছাড়াও শীত শীত লাগার অনুভূত হতে পারে।
জ্বর দ্রুত আসে, মাথা ও দেহ ব্যথা করে। পীত জ্বর, ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া প্রায় সময়েই এইভাবে শুরু হয়। জাপানী এনসেফালাইটিসও হঠাৎ জ্বর দ্বারা শুরু হতে পারে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জ্বর সাধারণতঃ তীব্র হয়, ৩৮.৫° সে (১০১° ফা) বা তারও বেশী। জিকার জ্বর সাধারণতঃ নীচু মাত্রার হয়, ৩৮.৫° সে (১০১° ফা) থেকে কম।
অনেক অসুস্থ্যতাতেই জ্বর দেখা দেয়। জ্বর সম্পর্কে আরও জানতে অসুস্থ্য ব্যক্তিকে পরীক্ষা করা (সংকলিত হচ্ছে) দেখুন এবং জ্বর সৃষ্টি করে এমন শিশুকালীন অসুস্থ্যতা সম্পর্কে জানতে শিশুদের পরিচর্যা অধ্যায় (সংকলিত হচ্ছে)দেখুন।
ফুসকুড়ি আছে কি?
জিকার ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি প্রায় সময়ই দেখা যাবে এবং চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, এবং ওয়েষ্ট নাইল জ্বরের ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি দেখা যাওয়া একটি সাধারণ ব্যাপার। ম্যালেরিয়া, পীত জ্বর, বা জাপানী এনসেফালাইটিস এর ক্ষেত্রে সাধারণতঃ ফুসকুড়ি দেখা যায় না।
ফুসকুড়ি হাম বা মশাবাহিত নয় এমন অন্যান্য সাধারণ অসুস্থ্যতার লক্ষণও হতে পারে।
অস্থি ও সন্ধিতে কোন ব্যথা আছে কিনা?
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, এবং জিকায় সাধারণতঃ দেহে ব্যথা ও বেদনা থাকে। ম্যালেরিয়ায় ব্যথা সাধারণতঃ থাকেই না। অস্থিতে বা পেশীতে ব্যথা হলে তা খুব সম্ভব ডেঙ্গু এবং ব্যথাসহ ফুলে যাওয়া সন্ধি খুব সম্ভব চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ।
সন্ধিতে ব্যথা আঁটুলিবাহিত ভাইরাসসহ অন্য কোন সমস্যার লক্ষণ হতে পারে যেগুলো মশাবাহিত নয়।
চোখ লাল ও জ্বালা করে?
জ্বালা করা চোখ জিকার সাধারণ লক্ষণ এবং কোন কোন সময় চিকুনগুনিয়া ও পীত জ্বরেও তা দেখা যায়।

মশাবাহিত অসুস্থ্যতার বিপদ চিহ্ন যেগুলোর জন্য জরুরী সাহায্য প্রয়োজন

  • গুরুতর ম্যালেরিয়া, গুরুতর ওয়েষ্ট নাইল ভাইরাস বা গুরুতর জাপানী এনসেফালাইটিস-এর ক্ষেত্রে খিঁচুনী এবং জ্ঞান লোপ পাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
  • গুরুতর পীত জ্বর বা গুরুতর ডেঙ্গু থেকে দেহের ভিতরে বা মুখ, মাঢ়ি, নাক, চোখ, বা ত্বক থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। অভিঘাতের লক্ষণগুলো খেয়াল করুন: ত্বক ঠাণ্ডা হয়ে যায়, রক্ত চাপ কমে যায়, এবং নাড়ীর স্পন্দন দ্রুত হয় (প্রাথমিক চিকিৎসা অধ্যায়ের পৃষ্ঠা ১১ দেখুন)। ফুলে ওঠা পেটও আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের একটি লক্ষণ হতে পারে।


জ্বরের মাত্রা যদি ৪০° (১০৪°ফা) হয় তবে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে শীঘ্রই দেখা করুন। তাপমাত্রা যদি তার থেকেও বেশী হয় তবে তা একটি জরুরী অবস্থা।

আপনার ম্যালেরিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে এবং আপনি গর্ভবতী হলে, আপনি যদি একটি শিশুর মশাবাহিত রোগ হয়েছে বলে ধারণা করেন, বা কোন বয়স্ক ব্যক্তির বা সঙ্কটজনক স্বাস্থ্য সমস্যাযুক্ত ব্যক্তির অসুস্থ্যতা থাকলে অবশ্যই একজন স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে দেখা করুন। যদি বেদনাদায়ক ব্যথা ২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে বা আপনার পা, বাহু বা মুখে গুরুতর দুর্বলতা থাকে, টন টন করে, বা কোন অনুভূতিই না থাকে তবে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে দেখা করুন। এটি হয়তো গিয়া-বারে সিন্ড্রোমের একটি লক্ষণ হতে পারে, যা মশা থেকে সৃষ্ট অসুস্থ্যতার পরপরই হতে পারে এমন একটি গুরুতর অবস্থা। এটির সবথেকে ভাল চিকিৎসা করা যায় হাসপাতালে।

আপনার মশাবাহিত কোন রোগ রয়েছে এবং আপনার কী করা উচিত?

যেহেতু এই অসুস্থ্যতাগুলোর লক্ষণগুলো প্রায় একই রকমের তাই ব্যক্তির কোন রোগটি হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। এটি যদি ম্যালেরিয়া হয়ে থাকে তবে আর দেরী না করে ম্যালেরিয়া পরীক্ষা করলে ব্যক্তির জন্য দ্রুত ম্যালেরিয়ার ঔষধ শুরু করা সম্ভব হবে, বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যদি সে গর্ভবতী, খুবই কম বয়স্ক বা বয়স্ক ব্যক্তি হয়, বা তার এইচআইভি থাকে। জিকা হতে পারে এমন একজন নারীর সেরে না ওঠা পর্যন্ত গর্ভবতী হবার চেষ্টা করায় দেরী করা উচিত। গর্ভবতী অবস্থায় জিকা বিপজ্জনক হতে পারে

অসুস্থ্যতা কোনটি তা আপনি যদি নাও জানেন তবুও অসুস্থ্যতা লঘু থাকলে জলপূর্ণতা, বিশ্রাম, এবং প্যারাসিটামল (এসিটামিনোফেন) দ্বারা এর চিকিৎসা করুন। ব্যক্তিটি যদি খারাপ অনুভব করে বা সেরে না ওঠে তবে একজন স্বাস্থ্য কর্মীর সাথে দেখা করুন।

ঢাকনাসহ দু'টি জল রাখার পাত্র
অসুস্থ্যতা রোধ করতে যে সমস্ত জায়গায় মশা বংশবৃদ্ধি করতে পারে সে সমস্ত জায়গা পরিষ্কার করুন এবং জল রাখার পাত্রগুলো ঢেকে রাখুন।

কারা এবং কতজন মানুষ অসুস্থ্য তা স্বাস্থ্য কর্মী এবং আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জানালে কখন তাদের মশা রোধ করার জন্য এলাকাব্যাপী কার্যক্রম হাতে নিতে হবে তা জানতে সাহায্য করতে পারে।

মশা দ্বারা সৃষ্ট অসুস্থ্যতা রোধ করা

যে সমস্ত এলাকায় পীত জ্বর বা জাপানী এনসেফালাইটিস দেখতে পাওয়া যায়, সেখানে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের টীকা দেয়ার মাধ্যমে এই অসুস্থ্যতাগুলো রোধ করা যায়। যেখানে মশা মারার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করা হয় সেখানে আপনি কিভাবে ওগুলো ব্যবহার করেন সে বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করুন কারণ কীটনাশক মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি করতে পারেমশার কামড় রোধ করা এবং অন্যান্য পদ্ধতির মাধ্যমে মশার বংশ বিস্তার রোধ করা আরও বেশী নিরাপদ ও আরও কার্যকর হতে পারে।



এই পাতাটি হালনাগাদ করা হয়েছে: ২৩ মে ২০১৯